স্মার্ট শহরের ইতিবৃত্ত [Story of the smart city in Bengali] by Gopa Samanta and Ayona Datta

স্মার্ট শহরের ইতিবৃত্ত [Story of  the smart city]

 গোপা সামন্ত ও অয়োনা দত্ত [Gopa Samanta and Ayona Datta]

স্মার্ট ফোন, স্মার্ট টিভি – র হাত ধরে ‘বিশ্বায়িত ভারতবর্ষে’ এসে পড়ল স্মার্ট শহর। গুজরাট, মহারাষ্ট্রের মত দু’একটি রাজ্যে পরিকল্পনা আগে শুরু হলেও সমগ্র ভারতবর্ষের প্রায় সব রাজ্য মিলিয়ে একশোটি স্মার্ট শহর তৈরির প্রকল্প নতুন সরকারের বাজেট বক্তৃতায় ঘোষণা করা হয়েছে। বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের একটু বুঝে নেওয়া দরকার স্মার্ট শহর ঠিক কী ও কেন?

অভিধানে স্মার্ট শব্দের যে সব অর্থ পাওয়া যায় তার মধ্যে বেশির ভাগই হল ব্যক্তিবিশেষের বিশেষণ। এগুলি হল – বুদ্ধিমান, ফিটফাট, ফ্যাশনদুরস্ত, চটপটে, দক্ষ পরিষ্কার, আকর্ষণীয়, দেখতে-নতুন এবং সর্বোপরি ধনী ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত। এখন ব্যক্তিবিশেষের বিশেষণগুলো বাদ দিয়ে বাকি শব্দের মিলিত সাহায্যে যদি স্মার্ট শহরের সংজ্ঞা নির্ধারণ করার চেষ্টা করা হয় তাহলে যা দাঁড়ায় তা হল – পরিষ্কার, ফিটফাট, আকর্ষণীয়, দক্ষ এবং সংযুক্ত শহর।

তবে, আমরা যদি আবার সরাসরি স্মার্ট শহরের সংজ্ঞা খুঁজি, উইকিপিডিয়া জানায় যে, এ শহর হল এমন শহর যেখানে মানব ও সামাজিক লগ্নি, ঐতিহ্যগত পরিবহণ এবং আধুনিক যোগাযোগের সম্মিলিত মেলবন্ধনে তৈরি হয় ধারণযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জীবনের উচ্চ গুণগত মান। আর এসবের জন্য প্রয়োজন হয় নাগরিকদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে প্রাকৃতিক সম্পদের বিবেচক পরিচালন। অনেকে আবার মনে করেন স্মার্ট শহরের মূলকথা হল দক্ষতা ও গতি যার ভিত্তি হল বুদ্ধিদীপ্ত পরিচালন এবং অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সবমিলিয়ে সু-শাসন।

স্মার্ট শহরের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ঠ্য থেকে একথা বেশ স্পষ্ট যে, এই ধরণের শহর হল পরিকল্পিত এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নতুন শহর। কারণ, বর্তমান শহরকে এত গুণসম্পন্ন করে তোলাটা সহজ নয়। তাই নতুনভাবে গড়ে তোলাটাই যুক্তিযুক্ত। এসব শহর তো তৈরি করবে মূলত বড় কর্পোরেট হাউসের ব্যক্তিগত মূলধন। আর সারাই-এর থেকে নতুন তৈরিতে যে ব্যক্তিগত মূলধন বেশি আগ্রহী, সে আমরা আর কে না জানি!

স্মার্ট শহর একধরণের পরিকল্পিত শহর আর পরিকল্পিত শহর এদেশে নতুন নয়। সেই ইংরেজ আমল থেকেই ভারতবর্ষে ‘সে ট্রাডিশন সমানে চলেছে’। ভারতবর্ষের মত উপনিবেশগুলিই ইংরেজ বাস্তুবিদ, স্থপতি ও শহর পরিকল্পকদের আকর্ষণ ও জীবিকার সুযোগ করে দিত। ভারতবর্ষে শহর পরিকল্পনার গোড়াপত্তন ঘটে প্রথমে বোম্বাই (১৮৯৮) ও কলকাতা (১৯১১) ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এইসব ইমপ্রুভমেন্টের অধিকাংশই ঘটত শহরের ঘিঞ্জি, নোংরা ও গরিব এলাকার উৎখাতের মধ্য দিয়ে। প্যাট্রিক গেডেস-এর মত দু-একজন পরিকল্পক যদিও পুরোনো শহরকে বাঁচিয়ে পরিকল্পনার চেষ্টা করতেন, বেশিরভাগই ছিলেন ‘ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ মতবাদের পক্ষে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শহর পরিকল্পনায় অন্যরকম জোয়ার এল। অনেক নতুন শহর যেমন চণ্ডীগড়, ভুবনেশ্বর, কল্যাণী, দুর্গাপুর তৈরি হল পরিকল্পনা করে। আবার অনেক বড় শহর যেমন দিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই শহরের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হল নতুন পরিকল্পিত, অংশ যথা – নিউ দিল্লি, বিধাননগর ও নাভি মুম্বাই। সত্তরের দশক পর্যন্ত ভারতবর্ষে নতুন শহর বা নতুন শহরাংশ তৈরির বাইরে যেটুকু শহর নিয়ে ভাবনা ও পরিকল্পনা লক্ষ করা যায় তা হল বড় শহরগুলিকে নিয়ে। এগুলির জন্য শুরু হয় ‘মাস্টার প্ল্যান’ নামের প্রকল্প। ছয় ও সাতের দশকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে যে অসংখ্য ছোট শহর গড়ে উঠেছিল একান্ত নিজের চেষ্টায়, তার সমগ্র দায়িত্ব রাজ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার মনের সুখে নিদ্রা যাচ্ছিল বলা যায়।

এর মধ্যে নব্বই-এর দশকে ভারতবর্ষে এসে পৌঁছোল খোলা অর্থনীতির হাওয়া। ব্যক্তিগত মূলধনের বিনিয়োগ ছোট শহরকে পাশ কাটিয়ে গেল তাদের দুর্বল পরিকাঠামোর জন্য। বড় শহরগুলিকে অর্থনৈতিক ইঞ্জিন হিসাবে দেখার চল শুরু হল। তারই অবধারিত ফল হিসেবে এসে গেল ‘জওহরলাল নেহরু ন্যাশনাল আরবান রিনিউয়াল মিশন’। এই প্রকল্পে প্রথমেই গুরুত্ব পেল দেশের পঁয়ষট্টিটি বড় শহর এবং পরবর্তী পর্যায়ে কিছু মাঝারি শহর। এই প্রকল্পের বড় অংশ খরচ হয় বড় শহরের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য, যার আবার সিংহ-ভাগ যায় শহরের ফ্লাইওভার তৈরির জন্য। ছোট ও মাঝারি শহরের জন্য এখন আর কোন আলাদা প্রকল্প নেই।

এখন যদি আমরা দেখি যে ভারতবর্ষের নগরায়ণ এখন ঠিক কী পর্যায়ে তাহলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় ২০১১ সালের জনগণনার দিকে। এই সময়ে এদেশে ছিল ৪৬টি মিলিয়ন শহর, ২৯৮টি পৌরপুঞ্জ, ৩,৫৬৫টি এক লক্ষের কম জনসংখ্যাবিশিষ্ট শহর। এই শহরগুলির বাইরে আছে ১,৬৬৯টি নগর পঞ্চায়েত ও ৩,৮১২টি সেনশাস শহর ও অসংখ্য আউটগ্রোথ যারা নগর দপ্তর ও নগর প্রকল্পের বাইরে আছে। এগুলির পরিচয় না-শহর না-গ্রাম হলেও জনসংখ্যার নিরিখে এগুলিও একসাথে শহরমুখি জনসংখ্যার অনেকখানি ধারণ করে। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় যে, প্রথম দুই শ্রেণির শহরগুলি জওহরলাল নেহরু ন্যাশনাল আরবান রিনিউয়াল নামক কেন্দ্রীয় প্রকল্পের দয়াদাক্ষিণ্য লাভ করে, সেগুলি বাদ দিলে বেশ কয়েক হাজার মাঝারি ও ছোট শহর এবং শহরের মত বসতিগুলিকে সমস্ত রকম পরিষেবার জন্য নির্ভর করতে হয় রাজ্য সরকারের বার্ষিক অনুদানের উপর। তাই সেগুলির পরিষেবা যারা না পেয়েছেন, তাদের পক্ষে অনুমান করাই কঠিন তা কী ধরণের। অবশ্য ভারতবর্ষের জনসংখ্যার বৃদ্ধি ও গ্রাম থেকে শহরমুখি অভিবাসনের ফলে এসব শহরেরও বৃদ্ধি কিন্তু থেমে নেই।

এর মধ্যে এত সব শহরকে পাশ কাটিয়ে ভারতবর্ষে চলে এল স্মার্ট শহরের জমানা। এখন দেখে নেওয়া যেতে পারে স্মার্ট শহরের উত্থানের ইতিহাসটা। এই ইতিহাস বেশিদিনের নয়। শুরুটা করেছিলেন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন। ‘ক্লিন্টন ফাউণ্ডেশন’ ২০০৫ সালে CISCO (সিসকো) নামের নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি কোম্পানিকে চ্যালেঞ্জ দিলেন কি করে প্রযুক্তির সাহায্যে শহরের সমস্যার সমাধান করে শহরগুলিকে ধারণযোগ্য (sustainable) করা যায় খুঁজে বার করতে। সিসকো কোম্পানি ২৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করে পাঁচ বছর ধরে গবেষণা করে তৈরি করল স্মার্ট শহরের মডেল। ২০১০ সালে ‘ক্লিন্টন ফাউণ্ডেশন’ এর সঙ্গে তাদের চুক্তি শেষ হতেই সিসকো বাজারে আনল ‘স্মার্ট শহর’ পণ্য।

এরই মধ্যে ২০০৮ সালে ‘গ্লোবায়িত’ বিশ্বে ঘটে গেছে অর্থনৈতিক বাজারের পতন। তার ফলে বড় বড় আই-টি কোম্পানিগুলি ভয় পায় ঐ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে। কিন্তু মূলধন তো রেসের ঘোড়া। তাই, তাকে তো আর বসিয়ে রাখা যায় না। আই-টি কোম্পানিগুলি আই.বি.এম., সিসকো-র হাত ধরে বাজারে নেমে পড়ল ‘স্মার্ট শহর’ বিক্রি করতে। বাজার শুরু আমেরিকা-ইউরোপে হলেও তা ক্রমাগত পূর্বদিকে সরতে থাকল আরব আমিরশাহি, চীন, ভারত, কোরিয়া প্রভৃতির দিকে। ভারতবর্ষে ছোট-খাট আকারে শুরু হয়েছিল গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে। এখন তো সারা ভারতবর্ষের সব রাজ্যেই ছড়িয়ে পরার অপেক্ষায়। ভারতবর্ষে স্মার্ট শহর-প্রযুক্তির প্রদীপে তেল দিয়েছেন ২০১০ সালে প্রকাশিত ম্যাকিনসে কোম্পানির রিপোর্ট। যাতে বলা হয়েছে ভারবর্ষের শহরবাসীর সংখ্যা ২০০৮ সালে ৩৪০ মিলিয়ন থেকে ২০৩০ সালে হয়ে দাঁড়াবে ৫৯০ মিলিয়ন। অর্থাৎ আমাদের প্রচুর শহর দরকার এত শহরমুখি লোকজনকে জায়গা দিতে।

তবে এই ৫৯০ মিলিয়ন শহরবাসীর কতজন হবেন স্মার্ট শহর প্রযুক্তির গ্রাহক আর কতজন কোনোমতে মাথা গোঁজার চেষ্টা করবে শহরের বস্তিতে, সে তথ্য আমাদের কাছে নেই। কিন্তু ২০১১ সালের সেনসাস থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তা বলছে যে, ভারতবর্ষের ১৩.৭৫ মিলিয়ন পরিবার অর্থাৎ মোট শহরবাসীর ১৭ শতাংশ বাস করে বস্তিতে। বস্তির মত অবস্থায় যারা বাস করেন তাদের বিষয়ে কোন তথ্য নেই। থাকলে ভারবর্ষের শহরবাসীদের ধনী ও গরিবের অনুপাতটা বোঝা যেত।

সম্প্রতি (অক্টোবর মাসে) প্রকাশিত হয়েছে একশোটি স্মার্ট শহরের তালিকা (সারণি-1)। এই স্মার্ট শহরগুলির জল, পয়ঃপ্রণালি, আবর্জনা পরিষ্কার ও পরিবহণ ব্যবস্থা তৈরির মোট খরচ ধরা হয়েছে কুড়ি বছরে সাত লক্ষ্য কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরে প্রয়োজন পঁয়ত্রিশ হাজার কোটি টাকা। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়াও হয়, এই টাকার বেশ কিছুটা আসবে ব্যক্তিগত পুঁজি থেকে, স্মার্ট শহরের প্রাথমিক ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারি খরচ পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

টাকা ছাড়া অন্য সমস্যাও আছে। স্মার্ট শহর তো পুরোনো শহর ভেঙে তৈরি করা যায় না, তাই দরকার ফাঁকা জায়গার। আর সেই ফাঁকা জায়গারই তো ভীষণ অভাব ভারতবর্ষে। তাই গুজরাতের ধোলেরায় স্মার্ট শহর তৈরি হচ্ছে যে জায়গায় সেখানে ৪০,০০০ চাষি ও গরিব লোককে উৎখাত করতে হবে। তা তো হবেই! কারণ সকলের ভালো-র জন্য তো বেছে বেছে গরিব ও প্রান্তিক চাষিদেরই বলি হতে হয়। তবে ধোলেরা-তেও JAAG-এর নেতৃত্বে শুরু হয়েছে ‘জমির অধিকার আন্দোলন’। চলছে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, আর তা দেখে কেটে পড়তে শুরু করেছে চঞ্চলা ব্যক্তিগত মূলধন। বড় বড় কোম্পানির কী দরকার পড়েছে এসব ঝামেলায় জড়ানোর! সরকার যদি ভয় দেখিয়ে বা ঠেঙ্গিয়ে গরিব চাষি ও শ্রমিকদের ভাগাতে না পারে তাহলে ব্যক্তিগত মূলধনের পুঁজিবাদীরা রিস্ক নেবে কেন? অর্থাৎ ধোলেরা-র ভবিষ্যতের ওপর কতকটা নির্ভর করছে ভারতবর্ষের স্মার্ট শহর বিনিয়োগের ভবিষ্যত।

আসুন, আমরা বরং ততক্ষণে চেষ্টা করতে থাকি স্মার্ট সিটি-র নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের। পরিষ্কার রাস্তাঘাট, সুশৃঙ্খলিত জন-পরিবহন ব্যবস্থা, আর পৌর পরিষেবার একটু নিয়মিত ব্যবস্থাপনা থাকলেই ছোট-বড় শহরকেই কেমন স্মার্ট মনে হয় না! আর এটুকুর জন্য কি খুব বেশি প্রযুক্তির দরকার আছে? প্রয়োজন পড়ে সামান্য মূলধন, কাজ ঠিকমত করার মানসিকতা ও ব্যবস্থাপনা। কেউ কেউ আবার এও বলছেন যে, ‘মাথার উপর ছাদ, রাস্তায় জনগণের উপযুক্ত পরিবহণ ব্যবস্থা ও প্রতি বাড়িতে শৌচাগার’ থাকলেই সে শহরকে স্মার্ট শহর বলা যায়। সবশেষে বলি ভারতবর্ষের প্রতিটি শহরই বেশ স্মার্ট কারণ কত কিছু না-থাকা সত্ত্বেও এগুলি কেমন দিব্যি চলছে, ব্যবস্থাদি ভেঙে পড়েনি তো!

 

Acknowledgement: This article was originally published in Bengali in Shrutibak, March 2016.

IMAGE © ALL RIGHTS RESERVED BY AYONA DATTA.
Advertisements

One Comment Add yours

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s